হযরত আল্লামা শাহ ছুফি সৈয়্যদ কলিমুল্লাহ শাহ (রাহ:) ও শাহজাদা হযরত আল্লামা সৈয়্যদ শাহাদাত হোসাইন (রাহ:) এর সংক্ষিপ্ত কর্ম ও জীবন

জগলুল হুদা:
মহান ¯্রষ্টা এ পৃথিবীতে আমাদের পাঠিয়েছেন একমাত্র তাঁর ইবাদাত করার জন্য। অন্যদিকে হেদায়তের গাইডলাইন হিসাবে যুগে যুগে নবী-রাসূল (সা:) এবং অলি-বুজুর্গ এসেছেন-আসবেন মানবতার কল্যাণের জন্য। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মুক্তি ও কল্যাণের পথে মানবজাতীকে আহবান করা। ভারতীয় উপমহাদেশে কোন নবী রাসূল আলাইসাল্লামের আগমন হয়নি। এ বিশাল উপমহাদেশে ইসলামের আলোকবর্তিকা নিয়ে আসেন আরব থেকে আল্লাহ’র নৈকট্যধন্য আউলিয়া কেরামগণ। যাদের কস্টসাধ্য ধর্মীয় প্রসারের কারণে আজ আমরা পেয়েছি ইসলামের শান্তিময় সংগঠিত একটি সহজ সরল পথ। চট্টলা কে বারো আউলিয়ার দেশ বলা হয়। এ বারো জন সহ অসংখ্য ধর্মভীরু আউলিয়া ইসলামের প্রসারে চট্টগ্রামে আসেন যা আমরা “চট্টগ্রামের ইতিহাস, ইসলাম প্রচার ও চট্টগ্রাম” নামক গ্রন্থ গুলো পর্যোলোচনা করলে পাই। চট্টগ্রামে ইসলামের বাণী প্রচারে সতের শতাব্দীর পূর্বে সুদূর আরব থেকে বাগদাদ হয়ে দলবেঁধে এসে বিভিন্ন স্থান ভাগ করে দ্বীনি কাজ করতে যারা এসেছেন তাঁদের মধ্যে শাহ্সূফি পীরে কামেল কলিমুল্লাহ শাহ্ (রাহঃ) এর পূর্ব পুরুষরা অন্যতম।
হযরত শাহ্সূফি পীরে কামেল আল্লামা কলিমুল্লাহ্ শাহ্ (রাহঃ) চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর সৈয়দবাড়ী দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বীনের কাজ শুরু করেন। তিনি হয়রত গাউছুল আজম আহমদ উল্লাহ (রাহঃ) এর সমকালের ও তাঁর সাথে ভাল সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। শাহ্ সূফি কলিমুল্লাহ্ শাহ্ (রাহঃ) উনার নছল মোবারকে ১৯৩২ সালের ২৬ অক্টোবর বিলাদতে ধন্য হয় তাঁর একমাত্র শাহাজাদা হযরত আল্লামা শায়খ শাহাদাত হোসাইন (রাহঃ)। হযরত কলিমুল্লাহ্ শাহ্ (রাহঃ) ১০শে নভেম্বর ১৯২৯ সালের রোজ রবিবার মাগরিবের মহা বরকত ময় সময়ে তাঁর শাহাজাদা কে মতান্তরে সাত বা নয় বছর বয়সে নশ্বর পৃথিবীতে রেখে পরকালিন শান্তির বাগিছায় পাড়ি জমান। পিতাকে হারিয়ে আত্মহারা হয়ে যান ছোট মাসুম শাহাজাদা আল্লামা শায়খ সৈয়্যদ শাহাদাত হোসাইন (রহ.)। পিতার শোক কাটিয়ে তিনি জ্ঞান অর্জনে অগ্রসর করেন। প্রথমত দ্বীনি জাহেরী এবং বাতেনী শিক্ষা অর্জন করেন চট্টগ্রামে এবং পান্ডিত্য লাভের উদ্দ্যেশ্যে ভারতীয় হযরত নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী (রাহঃ) এর প্রতিষ্ঠিত দরসে নেজামিয়া মাদ্রাসা থেকে বিশেষ ডিগ্রী লাভ করেন। পরে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে দীর্ঘ ৯৭ বছর যাবত পিতার যাবতীয় শরীয়ত ও তরিক্বতের কাজের আনঞ্জাম দেন। উল্লেখ্য যে তিনি নেজামিয়া মাদ্রাসায় পড়া কালিন সময়ে সবার চেয়ে একটু আলাদা ছিলেন যা সবার দৃষ্টিগোচর হয়। একবার তাঁর মুহতারামা আম্মাজান তাঁর নিকট একটা পত্র পাঠান। সে পত্রখানা তিনি গ্রহন করেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের হযরত নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদীর ছাহেবজাদা থেকে। সেখানে ওনার নাম মোবারক দেখে শাহাজাদায়ে নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী ওনাকে বলেন, “তুমি তো আওলাদে রাসূল (দঃ)। তোমার নামের পূর্বে অবশ্যই সৈয়দ লিখবা। এর পর থেকে তিনি নামের পূর্বে সৈয়দ শব্দ টা লেখেন। এভাবে তিনি নিজেকে জাহিরবিমুখ ছিলেন। চলাফেরায় সাধারণ বেশে ছিলো। তাই হয়ত আমরা জাহিরী দুনিয়াতে তাঁকে ছিনতে পারিনি, আজ বেছালের পর সবাই টের পাচ্ছে তাঁর শান মান ইখলাছ ও আধ্যত্মিকতা।
আল্লামা শায়খ শাহাদাত হোসাইন (রাহঃ) কাদেরীয়া তরিক্বতের চর্চার ধারক ছিলেন। একদা হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রাহঃ) চট্টগ্রাম জামেয়াস্থ আলমগীরী খানকায় বাদে ফজর মজলিসে বসে আছেন। সবাই নাস্তা করার জন্য প্রস্তুত হলো। হযরত সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি (রাহঃ) সবাইকে নিদের্শ দিলেন তোমরা নাস্তা করে নাও। তখন সবাই আরজ করলো হুজুর আপনি খাবেন না? তখন তিনি প্রদুত্তরে বললেন, আমার জন্য নাস্তা আসতেছে! এর ঠিক একটু পর সেখানে হঠাৎ হাজির হলেন হযরত শায়খ শাহাদাত হোসাইন (রাহঃ)। তিনি সালাম ও মুসাফা করে তার পকেট থেকে কিছু নাস্তা হালুয়া সহ বাহির করে দিলেন। তখন এগুলো দিয়ে হযরত সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি নাস্তা করলেন। এ ঘটনা দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে যান। কারণ উনি যে আলমগীরি খানকায় যাবেন তা কেউ জানে না। তবে স্রষ্টার কি মহিমা আল্লাহর কামেলিন গণ সব জান্তক। তাই ওনি ওনার মনের শান্তধারায় অপেক্ষমাণ ছিলেন। তিনি সৈয়দ আহমদ (রাহঃ) কাদেরীয়ার তরিক্বতের তালিম নেন। হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ (রাহঃ) তাঁকে নছিহত করেন, “আপনি চলে যান এবং ঘরে গিয়ে তালিম চালিয়ে যান আর এখানে আমার কাছে আসতে হবে না”। বাস্তবেই তা হল। এরপর কোন সময়ে তাঁদের মধ্যে স্বশরীরে সাক্ষাত হয়নি। কি বেলায়তি ঝুলহাস সাধারণ মানুষ বুঝার বাহিরে তাঁদের আধ্যাত্মিক কথোপকতন চলত।
হযরত আল্লামা শায়খ শাহাদাত হোসাইন (রা:) ১৯৯৩ সালে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন এবং মদীনা মুনোওয়ারা জিয়ারত করেন। উল্লেখ্য যে তিনি মদীনায় অবস্থান কালে সর্বদা রাসূল (সা:) এর প্রেম বিরহে ব্যাকুল থাকতেন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে প্রেমাস্পদ প্রিয় হাবীব (সা:) উনার দিদারে ধন্য হন। স্বপ্ন বা খাব অস্বীকার করার কোন সাধ্য নেই কারণ সহী সিত্তার হাদীসে রাসূল (সা:) ঘোষাণা দিয়েছেন,”যে আমাকে স্বপ্ন দেখল, সে সত্যি আমাকে দেখল কারণ জ্বিন বা শয়তান রাসূলের (সা:) এর রূপ ধারন করতে পারবে না।”
হযরত আল্লামা শায়খ শাহাদাত (রহ.) একজন সচ্চ ও সাদামনের প্রকৃত রাসূল প্রেমিক ছিলেন। তাঁর কাছে যেকোন সমস্যায় দোয়ার আরজি নিয়ে বহু লোক সমাগম হত। সবার জন্য তাঁর দরজা উম্মুক্ত ছিল। অবশেষে হাজারো আশেক দ্বীনকে কান্দিয়ে না ফিরার দেশে অসীম অন্তরালে আরামে দিদারে ইলাহীতে মগ্ন হলেন হযরত শায়খ আল্লামা শাহাদাত হোসাইন (রহ.)। ২১শে জানুয়ারী ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ রোজ রবিবার মাগরিবের বরকত ময় সময়ে তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। তিনার বেছালের পূর্বে বিশেষ নছিহত ছিল, “তাঁর জানাযায় যারা আসবেন প্রত্যেকের প্রতি তাঁর সালাম ও তিনিও সবার জন্য দোয়া করছেন। তাঁর জন্যও যেন সবাই দোয়া করে”। তিনাদের স্মরনে সৈয়্যদ বাড়ি দরবারে শরীয়ত সম্মত ভাবে প্রতিবছর ঈসালে ছাওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
আজ মঙ্গলবার (১২ই ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০ টা হতে পীরে কামেল হযরতুল আল্লামা শাহ ছুফি সৈয়্যদ কলিমুল্লাহ্ শাহ্ (রাহঃ) উনার ৯০ তম ওরশ শরীফ ও উনার একমাত্র শাহাজাদা হযরতুল আলহাজ্ব আল্লামা সৈয়্যদ শাহাদাত হোসাইন (রাহঃ) উনার ২য় সালানা ওরশ শরীফ উপলক্ষ্যে রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ধামাইর হাট সৈয়্যদ বাড়ী দরবারে আজিমুশান মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে।
এছাড়াও থাকছে মানবতার কল্যাণে হেল্প ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ’র বিশেষ আয়োজন বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা কর্মসূচী। এই মহতী কর্মসূচীতে থাকবে, ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়, ব্লাাড প্রেশার পরীক্ষা, ডায়বেটিস পরীক্ষাসহ প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা কর্মসূচী সহ মাহফিলে উপস্থিত থাকতে সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েনে আয়োজক কমিটির নেতৃবৃন্দ। লেখক- সাংবাদিক

289 total views, 18 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.