মাথা উঁচু করে চলার আহ্বান মঙ্গল শোভাযাত্রায়

পুরনো জরাজীর্ণতা কাটিয়ে তরুণদের মাথা উঁচু করে উর্ধ্বপানে চলার আহ্বান জানিয়ে এ বছর যাত্রা করলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা রবিবার সকাল নয়টায় চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে যাত্রা করে। শাহবাগ হয়ে শিশুপার্ক ঘুরে আবার চারুকলায় এসে শেষ হয়।

‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’- এই প্রতিপাদ্যে এবার সকল মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতীক ‘পঙ্খীরাজ ঘোড়া’, যার মুখটা মানুষের মতো। রূপকথার আশ্রয়ে তরুণদের ঊর্ধ্বপানে চাইবার এবং চলবার আহ্বান জানানো হবে এর মাধ্যমে। তরুণ প্রজন্মকে মাথা তুলে দাঁড়াবার, সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানোর প্রয়াস এই শ্লোগানে। সব বাধা পেরিয়ে অনন্ত সম্ভাবনার সামনে তরুণ প্রজন্ম। সেই কথাই তাদের সামনে তুলে ধরা।

১৯৮৫ সালে সামরিক স্বৈরাচার ক্ষমতায় থাকাকালে হিরণ্ময় চন্দ নামের কয়েকজন তখন মাত্র চারুকলায় পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে চলে যান যশোরে, নিজের শহরে। চারুকলা শেষ করে সেখানেই গড়ে তোলেন চারুপীঠ। রঙ, পেন্সিল আর কাদামাটি দিয়ে সেখানে শিশুরা মেতে উঠলো। সে বছরই বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। যশোর শহরে এই তরুণদের আয়োজনে চৈত্রের শেষ রাতে আল্পনা আঁকা হতে থাকে। আর শোভাযাত্রার জন্য পরী ও পাখি তৈরি করেন মাহবুব জামাল, হিরণ্ময় তৈরি করেন বাঘের মুখোশ। পরদিন ছেলেরা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়ি পরে সানাইয়ের সুরে, ঢাকের তালে নেচে গেয়ে প্রদক্ষিণ করে যশোর শহর, আর এর মাধ্যমে সেদিনই জন্ম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার, এই ইতিহাস জানালেন স্বয়ং মাহবুব জামাল। বলেন, জীবনের সব রূপ-রঙ যেন ফিরিয়ে আনতে পারি, সে চেষ্টাটাই করেছিলাম তখন। তখন তার নাম ছিল বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। পরের বছর শহরের অন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যোগ দেয় চারুপীঠের এই আয়োজনের সঙ্গে, গঠিত হয় বর্ষবরণ পরিষদ। সাড়ে তিন হাজার মুখোশ, বড় হাতিসহ অন্য সব কিছু তৈরি করা হয়েছিল সে বছর। এখন যে শোভাযাত্রা হয় তার আদল তৈরি হলো সেবার।

১৯৮৮ সালে আবার পড়াশোনার জন্য আসেন মাহবুব জামাল। ১৯৮৯ সালে চারুকলার শিক্ষার্থীদের মঙ্গল শোভাযাত্রা করতে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের আয়োজনে সেবারই প্রথম ঢাকায় বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। তারপরের বছর চারু শিল্পী সংসদ, নবীন-প্রবীণ সব চারুশিল্পী এতে অংশ নেন। ছিলেন সালেহ মাহমুদ, ফরিদুল কাদের, ফারুক এলাহী, সাখাওয়াত হোসেন, শহীদ আহমেদ। সঙ্গে যোগ দেন তরুণ ঘোষ ও সাইদুল হক জুইস ও তৎকালীন ছাত্ররা। পরে যুক্ত হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সবার অংশগ্রহণে একটি জাতীয় উৎসবের পরিকল্পনা করেন তারা। এরপর ধীরে ধীরে সেটি ছড়িয়ে পরে ‍পুরো বাংলাদেশে।

সেবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল চারুকলার শিল্পীরা তাদের তৈরি করা মুখোশ, ভাস্কর্য নিয়ে থাকবেন শোভাযাত্রার সামনের অংশে। কিন্তু এমন একটি অনুষ্ঠান করার মতো আর্থিক সক্ষমতা তখন চারুশিল্পী সংসদের কাছে ছিল না। সে সময় এগিয়ে আসেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ফয়েজ আহমেদ। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু টাকা এনে দেন। আর সে শোভাযাত্রার পুরো পরিকল্পনা ছিল শিল্পী ইমদাদ হোসেনের। প্রথমে বৈশাখী শোভাযাত্রা নামকরণ হওয়ার কথা থাকলেও যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা নামই চূড়ান্ত হয় বলে জানান তিনি।

প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রর পোস্টার করেছিলেন সাইদুল হক জুইস। ‘লক্ষ্মীসরা’ ছিল সেই পোস্টারের প্রতিপাদ্য। মুখোশ কী করে বানাতে হয়, বিদেশ থেকে শিখে আসেন তরুণ ঘোষ। এভাবেই নিজেরা নিজেদের কাজ করে আর পরিচিত-বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা এনে সেই শোভাযাত্রা হয়েছিল। এরপর থেকে সেটি পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ হতে থাকলো। আর এখন যশোরের সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, দেশ বিদেশের কত-শত মানুষ বৈশাখের প্রথমদিনে চারুকলার সামনের এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। চারুকলার শিক্ষার্থীদের রাতদিন পরিশ্রমের ফলে শোভাযাত্রায় স্থান পায় নানা মুখোশ, হাতি ঘোড়া, মা ও সন্তানসহ নানা শিল্পকর্ম।

এর আগে, সকালে সামাজিক সকল অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে শুভবোধ জাগিয়ে তোলার মানসে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে গানে গানে বরণ করছে ছায়ানট। ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’ এই আহ্বান নিয়ে সাজানো হয়েছে রমনার বটমূলের আজকের প্রভাতী আয়োজন। তবে যথারীতি, পহেলা বৈশাখ ভোর সোয়া ছয়টায় বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানানো হয় রাগালাপ দিয়ে। প্রত্যূষে শিল্পীরা গাইছে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের গুচ্ছ। এরপরেই গেয়েছে অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী। গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালবাসবার প্রত্যয় দীপ্ত উচ্চারণ রয়েছে তাতে।

99 total views, 3 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.