রাণীনগরে ঝুট কাপড়ে দড়ি তৈরীতে পাল্টে যাচ্ছে নারী-পুরুষের জীবনযাত্রার মান

কাজী আনিছুর রহমান,রাণীনগর (নওগাঁ) : নওগাঁর রাণীনগরে সদর ইউনিয়ন ও তার আশপাশের প্রতিটি বাড়ি যেন এক একটি ঝুট কাপড় থেকে দড়ি তৈরির কারখানা। এখানে ঝুটের কাপড় থেকে তৈরি হচ্ছে নানান রঙ-বেরঙের বিভিন্ন সাইজের দড়ি। যা পাল্টে যাচ্ছে প্রান্তি জনপদের অসহায় নারী-পুরুষের জীবন-যাত্রার মান ও গ্রামীণ অর্থনীতি। পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নের অর্থনীতির চাকা স্বচল রাখতে নিরব ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
উপজেলা সদরের পূর্ব বালুভরা, পশ্চিম বালূভরা, বেলবাড়ি, দাউদপুর, রাজাপুর, ভুত রাজাপুর, খট্টেশ্বর, রণসিংগাড়, লোহাচূড়া, বিষ্ণপুর, কাশিমপুর ইউনিয়নের কুবরাতলী, কুজাইল, কাশিমপুর, ভবানীপুর, দূর্গাপুর ও কালীগ্রাম ইউনিয়নের করজগ্রামসহ উপজেলার বেশ কিছু এলাকার প্রায় হাজার খানিক বাড়িতে পরিবারের সকল সদস্য মিলে প্রায় ২০ হাজার নারী-পুরুষ এই পেশার সাথে জরিত। এই পেশাকে সামনে রেখে এখানে গড়ে উঠেছে ছোট-খাটো ঝুট কাপড়ের দোকান ও বাজার। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা, দক্ষ শ্রমিক, পুঁজি সংকট এবং বাজার বসার মত নির্ধারিত পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় নানা রকমের সমস্যার সম্মুখিন হতে হচ্ছে দঁড়ি তৈরির সাথে জরিত ও ব্যবসায়ীদের। সরকার পক্ষ থেকে প্রাথমিক ভাবে ঋন ও প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পেলে এখানকার দঁড়ি শিল্প জাতীয় উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন এই পেশার সাথে জড়িতরা।
প্রতিটি ঝুট কাপড়ের বস্তার ওজন ৮০-৮৫ কেজি। প্রতিকেজি ঝুট কাপড়ের দাম ৪৫ টাকা। একটি বস্তা থেকে দড়ি তৈরী করে বিক্রির পর লাভ আসে প্রায় এক হাজার ৫ শ’ টাকা। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে সপ্তাহে দুই বস্তা ঝুট কাপড় থেকে দড়ি তৈরী করা যায়। এই পেশার সাথে জড়িতরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। সেই সাথে বেকারত্ব দূর হবে এমনটাই আশা করেন সচেতন মহল।
উপজেলার পূর্ব বালুভরা গ্রামের তালেব আলীর ছেলে মো: ইসলাম আলী ঝুট কাপড় থেকে দঁড়ি তৈরি করে কিভাবে এই গ্রামের চিত্র পাল্টে যাচ্ছে সে ব্যাপারে তিনি জানান, এখানকার এক শ্রেণীর ঝুট কাপড় ব্যবসায়ী বছর চারেক আগে স্বল্প পরিসরে মাদুরের বেল্ট হিসেবে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ানগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে বিক্রয়ের জন্য এখানে নিয়ে আসতো। সেই কাপড় থেকে ধীরে ধীরে স্থানীয় কিছু বেকার যুবক-যুবতী এবং বয়জৈষ্ঠ নারী-পুরুষ মিলে দঁড়ি তৈরির কাজ শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে বেচা-কেনা মন্দ থাকলেও ধীরে ধীরে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের পান চাষিরা এবং কিছু খামারের মালিকরা জানতে পেরে রাণীনগর রেলগেটের পূর্ব পাশে বালুভরা গ্রামে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা দড়ি নিতে ভীড় জমায়।
বর্তমানে এখানে প্রতিদিন পরিবার ভেদে দুই থেকে আড়াই হাজার পিচ বিভিন্ন সাইজের দড়ি তৈরি করছে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও ভাল পাওয়ায় এই পেশার সাথে এখন অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে। বাড়ির ছোট-বড় সকল সদস্য মিলে দড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পাড় করে।
আর দড়ি তৈরীকে তারা পেশা হিসেবে বেঁছে নিয়েছেন। এই ঝুট কাপড় থেকে শিখা, গরু ও ছাগলের দড়ি তৈরী হয়। এই কাপড় থেকে তৈরী দড়ি মজবুত ও টেকশই বলে পানের বরজে বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় চাহিদাও বেশি। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ায় লাভের একটি অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে। সরকারী সহযোগীতা ও স্বল্প সুদে ঋণের দাবী করেছেন গ্রামীন এসব নারী-পুরুষরা।
দড়ি তৈরির কাজের সাথে জড়িত ওই গ্রামের সেতারা বেগম জানান, প্রতিবেশীদের দেখাদেখী আমিও ঝুট কাপড় থেকে দড়ি তৈরি করি। ফলে স্বামী-সংসারে কিছুটা বাড়তি আয় হয়। প্রতিদিন আমি নানান সাইজের প্রায় ১২ শ’ দড়ি তৈরি করি। বাজার চাহিদা ভাল থাকায় বেশ ভালই লাভ হয়। তবে পুঁজি সংকটের কারণে লাভের বড় অংশ মহাজনদেরকেই দিতে হয়। সরকারি সুযোগ সুবিধা আমাদের মত গরীব লোকজনদের দিলে এই পেশায় থেকেই আমাদের জীবন-মান উন্নয়ন করা সম্ভব।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খন্দকার মাকাম্মা মাহমুদ জানান, নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। রাণীনগরে যে সব নারীরা ঝুট কাপড় থেকে দড়ি তৈরি করে পারিবারিক ভাবে স্বাবলম্ভী হচ্ছে তারা যদি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে তাহলে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সহ অন্যান্য সহযোগিতার ব্যবস্থা প্রদাান করা যাবে।#

2,097 total views, 12 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.