মাদারীপুর উপজেলা নির্বাচন: হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর ইজ্জতের লড়াই


শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি :
নানা ঊৎকন্ঠা ও আতংকের মধ্যে দিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৮ জুন) শুরু হতে যাচ্ছে মাদারীপুর সদর উপজেলার পরিষদ নির্বাচন। বেশ কয়েকদিন ধরেই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের কারনে স্থানীয় ভোটাররা শংকিত। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবী করা হচ্ছে শতভাগ নিরপেক্ষ সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান খান। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মাদারীপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিনের অনুসারী। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান খান সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী ও মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শাজাহান খানের ছোটভাই।
ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদারীপুরে শাজাহান খান ও বাহাউদ্দিন নাছিমের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী, রাজনৈতিক কর্মসূচী দুপক্ষই আলাদাভাবে পালন করে আসছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দুই পক্ষের ইজ্জতের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। দুপক্ষই নির্বাচনে জয় পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে। প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিলসহ নানা কর্মসূচী করেন তারা।
প্রভাবশালী দুই নেতার পছন্দের প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে ইতোমধ্যে অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি। তবে, ভোটাররা চান সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।
নাম না প্রকাশে কয়েকজন ভোটার জানান, তারা পছন্দের প্রার্থীকেই ভোট দিতে চান। প্রশাসন ও সরকারের কাছে তাদের চাওয়া সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। তারা নির্বাচনে কোন ঝামেলা চান না। বিগত দিনে দুপক্ষ আধিপত্য ও নির্বাচন নিয়ে মারামারি করে, আর এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। তাই ভোটকেন্দ্রে যাওয়া ও ভোট দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসার সুষ্ঠু পরিবেশ চান তারা।
মাদারীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান পদে ২জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩জন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নের ১শ’ ১৫টি কেন্দ্রের ৬শ’ ৪৮টি কক্ষে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫শ’ ১৫জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩শ’ ৩৫ জন ও নারীর ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩১ হাজার ১শ’ ৬০ জন।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই। দলীয় নেতাকর্মীরা ভোট দিতে পারলে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত। তবে আনারসের কিছু সমর্থক নৌকার সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, এতে কোন লাভ নেই। জনগণ নৌকার পক্ষে রয়েছে।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান খান বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হলে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশা রয়েছে। চারদিকে শুধু আনারসের সমর্থক। তবে কেউ যদি নির্বাচনের দিন কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কেন্দ্র দখল করতে চায়, তাহলে জনগণ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলবে।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার সুব্রত কুমার হালাদার বলেন, ‘প্রতিটি কেন্দ্র একজন উপ-পরিদর্শক ও ৫জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে ১০জন আনসার সদস্যও নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। পাশাপাশি ৩টি কেন্দ্রে একটি মোবাইল টিম থাকবে ও ১০টি কেন্দ্রের জন্য একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। যাতে করে নির্বাচনে কেউ কোন রকমের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।’
তিনি আরো বলেন- ভোট কেন্দ্রে যদি কেউ বিশৃঙ্খলা বা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন তাকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। প্রয়োজনে সরাসরি গুলি করা হবে বলে তিনি জানান। ভোট কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ নিরস্ত্র ও সশস্ত্র র‌্যাব পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, ৩টি কেন্দ্রের জন্য একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। ভোট শান্তিপূর্ণ করতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। কোন ধরনের নাশকতা কিংবা অপ্রতিকর পরিবেশ তৈরি হতে দেয়া যাবেনা। এছাড়া ৫ প্লাটুন বিজিবিও নির্বাচনের কাজে দায়িত্ব পালন করবেন।
উল্লেখ্য, এই নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের ভিত্তিতে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান, উপ-পরিদর্শক শ্যামলেন্দু ঘোষ ও আঙ্গুল কাটা তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মো. রমজান কাজীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এছাড়া আধিপত্য নিয়ে দুই চেয়ারম্যান পদ প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে কয়েক দফা সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশত। এ পর্যন্ত প্রায় ৭/৮ টি থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.