নিকলীতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারে মাছ শূন্য নদ-নদী

শেখ উবাইদুল হক স¤্রাট, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি : কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরগুলোতে আইন লঙ্ঘন করে কারেন্টজালসহ নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। এসব জালের ব্যবহারে মৎশূণ্য হয়ে পড়ছে উপজেলার প্রধান প্রধান নদ-নদী এবং জলাশয়গুলো।
সারাবছর নদ-নদী, খাল-বিল ও বর্ষাকালে ভাসমান জলাশয়ে নিষিদ্ধ সব জালের ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েই চলছে। সব জায়গাতেই চলছে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরার উৎসব। হাওরের ধনু, ঘোড়াইত্রা, সোয়াইজনী, নরসুন্ধাসহ বিভিন্ন নদ-নদী, খালবিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও ছোট পাইজাল, বংজাল, গড়গড়িয়া জাল, কাচকিবেড়, দিয়ে অবাধে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের দেশীয় ছোট ও বড় মাছের পোনা। যা প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ। এসব জালের ব্যবহারে রক্ষা পাচ্ছে না ডিম ওয়ালা মা মাছসহ দেশীয় ছোট প্রজাতির সুস্বাদু মাছ।
একসময় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মুক্তজলাশয়, খাল-বিল, নদী-নালা মৎস সম্পদে ভরপুর ছিলো। কিন্তু বর্তমানে এসব নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারে জলাশয়গুলো মৎসশূণ্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। যে কারনে স্থানীয় বাজারগুলোতে মাছের আকাল বেড়েই চলছে। উপজেলার জলাশয়গুলোতে অতি ক্ষুদ্র ফাসের এসব অবৈধ জালের ফাঁদ দিয়ে মৎস প্রজাতির কোন পোকাই যেনো রক্ষা পাচ্ছে না। দিনের পর দিন এ নিষিদ্ধ জাল দিয়ে অসাধু জেলেরা ছোট ছোট মাছ শিকার করছে অবলীলায়। এতে ডিমওয়ালা মাছ, পোনামাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী অকালে মারা যাওয়ায় জীববৈচিত্র হুমকীতে পড়ছে।
স্থানীয় জেলে চান্দাঁলী (৪০) আঃ রফ মিয়া (৪৫) সহ অনেক জেলেদের অভিযোগ, নদ-নদীর ইজারাদার তাদের ডাককৃত নদীর সীমানা লঙ্ঘন করে বর্ষাকালে ভাসমান পানিকে তাদের ইজারাকৃত সীমানা বলে দাবি করে থাকে। তারা অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের লক্ষ্যে আমাদের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকে।
বরজু মিয়া (৫০) জানায়, জলমহাল ইজারাদারা কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন অবৈধ জাল ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বর্ষার মৌসুমে জালের দৈর্ঘ অনুসারে চাঁদা আদায় করে থাকেন। টাকা না দিয়ে মাছ ধরতে গেলে ইজারাদারদের পেটুয়া বাহীনির হাতে না’জেহাল হতে হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, নিকলীর নতুন বাজার, মজলিশপুর বাজার, রোদার পুড্ডাবাজার, হিলচিয়া বাজারে প্রকাশে নিষিদ্ধ জাল বিক্রয় করা হচ্ছে। এসব বাজারে প্রতি পাউন্ড কারেন্ট জাল ৮শত থেকে ১হাজার টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। বাজারগুলোতে পাইজাল, বংজাল, গড়গড়িয়া জাল, কাচকীবেড় (মশাড়ি নেট) জাল অবাধে বিক্রয় করা হচ্ছে। হতো দরিদ্র জেলেদেরকে দেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ মূল্যে লগ্নী (সুদ)টাকা। জেলেদের দরিদ্রতার সুযোগে মাছের আড়ৎগুলোও মাছ দেওয়ার শর্তে জেলেদেরকে জালের দাম দিয়ে আসছে বলে জানা যায়।তাছাড়া উপজেলার চারদিকেই নদী ও ভাসমান পানি তাই বাজারগুলোতেও খুবই সহজে পাওয়া যাচ্ছে অবৈধ সকল জাল।
বরুলিয়া, কাজলা, পৈতানিয়া, কুর্শা, ছেত্রা, মোহরকোণা, আলিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, সিংপুর, ভাটি- ভড়াটিয়া, ডুবি, ধীরুয়াইলসহ অসংখ্য হাওরে বর্ষার পানিতে ছোট ছোট নৌকায় প্রান্তিক জেলেরা এসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছে। এসব জালে বড় মাছের পোনার পাশাপাশি ধরা পড়ছে ডিমওয়ালা মা মাছ এবং পাঙ্গাস, রুই, কাতলা, ও আইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির অপরিপক্ক মাছ। এছাড়া ব্যাঙ, সাপ ও কুঁচেসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী ও আটকা পড়ছে। বিগত একদশকে স্থানীয় মৎস ভান্ডার থেকে বিল্প্তু হয়েছে টেংরা, বজুরী, মেনী, চান্দা, রাণী, গুতুমসহ রকমারি অনেক সু-স্বাদু মাছ।
স্থানীয়দের মতে মৎস আইনে কারেন্ট জাল, বাধাজাল, চটজালসহ ছোট ভাসের জাল ব্যবহার করে পোনা ও ডিম ওয়ালা মাছ নিধন নিষিদ্ধ থাকলেও আইনকে তোয়াক্কা না করে পোনা মাছসহ ডিমওয়ালা মাছ নিধনের মহোৎসবে মেতেছে জেলেরা। এ জালের ব্যবহারে দিন দিন মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। মাছ শূন্য হয়ে পড়ছে স্থানীয় বাজারগুলো আমিষের চাহিদা মিটছেনা স্থানীয়দের। তাদের মতে, কয়েক বছর যাবৎ জাতীয় মৎস দিবস উপলক্ষ্যে নাম মাত্র গুটি কয়েক লোক দেখানো অভিযান দিয়েই ক্লান্ত হয়ে যায় স্থানীয় মৎস বিভাগ।
হাওর গবেষক ও ছাতিরচর ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ হানিফ ইসলাম জানান, মৎস বিভাগ যথাযথভাবে তদারকি ও অভিযান না চালানোর কারণে জেলেরা ওই নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারে বিরত থাকছেনা। বরং এসব জালের ব্যবহারে প্রান্তিক জেলেরা উৎসাহিত হচ্ছে। এর ব্যবহার বন্ধ না হলে দেশি জাতের মাছ টিকবে না। বিপন্ন হবে সাপ, ও ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জীবন। বিনষ্ট হচ্ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রান্তিক জেলেদের কাছ থেকে জলমহালের ইজারাদারা অনৈতিকভাবে বিপুল পরিমাণে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
উপজেলা মৎস কর্মকর্তা মোঃ আবু সাঈদ জানান, ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অবৈধ জাল উদ্ধার করতে গেলে প্রভাবশালীতে তোপের মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া লোকবলের অভাবে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তবে জেলেদের সচেতনতা সৃষ্টি করে অবৈধ সকল জাল ব্যবহারের নিরুসাহিত করা হচ্ছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ.এম রুহুল ক্দ্দুুছ ভূইয়া জনি বলেন, বর্ষার মৌসুমে ভাসমান পানিতে এসব অবৈধ জালের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। আর বেশি মুনাফা লাভের আশায় পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে জলমহাল ইজারাদাররা। এসব ইজারাদাররা ইজারাকৃত নির্দিষ্ট ভূমি থেকে কয়েকগুণ বেশি ভোগ করে থাকে। জলমহালে আধিপাত্য বিস্তারে হাওর অঞ্চলে বৈধ অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও খুনাখুনীর মতো ঘটনা ঘটে থাকে। জলমহাল নীতি বাস্তবায়িত হলে এসকল সমস্যা হতো না। যে কারণেই সাধারণ জেলেরা বর্ষায় মৌসুম ভিত্তিক চাঁদা দিয়ে ভাসমান পানিতে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার অনুমতি পেয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.