মাগুরায় পলিথিন ডাক্তারের বিচারের দাবিতে ঝাড়ু মিছিল,

 মাগুরা প্রতিনিধি: মাগুরায় মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে এমবিবিএস চিকিৎসক হওয়া পলিথিন ডাক্তারখ্যাত মাসুদুল হকের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়াসহ মাগুরার সর্বস্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দ্রুতে পরিনত হয়েছে। ভুয়া এ ডাক্তারের বিচারের দাবিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষ। অবশেষে মঙ্গলবার (১৮ জুন) মাসুদুল হকের চিকিৎসা কার্যক্রম স্থগিততের আদেশ দিয়েছেন সিভিল সার্জন।
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম মাসুদুল হক। পলিথিন ডাক্তারখ্যাত এই চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারের ঘটনায় মাগুরায় অসংখ্য রোগী মারা যাওয়াসহ মৃত্যু পদযাত্রী বলে অভিযোগ উঠেছে। তার অপচিকিৎসার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে, তার বিরুদ্ধে কঠোর  ব্যাবস্থা নেয়াসহ বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার ভুক্তভোগী পরিবার, ক্লিনিক মালিক সমিতিসহ  মাগুরার সর্বস্তরের জনগন মানববন্ধন, ঝাড়ু মিছিলসহ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে।
এই বিতর্কিত চিকিৎসক মাগুরা শহরের জাহান ক্লিনিকের মালিক ও মাগুরা ডায়াবেটিক হাসপাতালের চিকিৎসক মাসুদুল হককে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্তু মাগুরার সিভিল সার্জন ডাক্তার প্রদীপ কুমার সাহা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। মাগুরা সিভিল সার্জন তার এক স্মারক নং সিএস/মাগুরা শা-১/২০১৯/১৩০৬/১(১৫) আদেশ পত্রে লিখেছেন, মাগুরা প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ওনারর্স এ্যাসোসিয়েশন  গত ১৬ জুন মাসুদুল হকের অপচিকিৎসার বিষয়ে নানা তথ্য প্রমানসহ মাগুরা জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়া ও  গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হবার প্রেক্ষিতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সম্প্রতি ৩ সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়। পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি  বিবেচনায় সিভিল সার্জন মঙ্গলবার এই আদেশ দিলেন।
এদিকে মাগুরা সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সামনে মাসুদুল হকের বিরুদ্ধে  ব্যাবস্থা নিতে ও বিচারের দাবীতে ঝাড়ু- মিছিল ও মানববন্ধন হয়েছে। মাগুরা প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ওনারর্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনিরুজ্জামান মিরাজ, সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আহমেদ, ডাক্তার বাবুল রশিদ, সোনি হসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এসময় বক্তব্য রাখেন।
এ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে মাগুরা ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ফরহাদ আহমেদসহ বিভিন্ন সুত্রের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসুদুল হক নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন মাগুরায় সব ধরনের অস্ত্রোপচারসহ নানা অপচিকিৎসা চালিয়ে আসছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি চিকিৎসক নন। নিজেকে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী হিসেবে পরিচয় দেয়ার পাশাপাশি পিজিটি, সিডিডি সার্জন এ ধরনের যোগ্যতার কথা উল্লেখ করেছেন এই ভুয়া ডাক্তার মাছুদুল হক। আসলে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস তিনি। জানা যায় ১৯৮৮ সালে বিশেষ বিবেচনায় এস,এস,সি ও ১৯৯০ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এইস, এস,সি পাস করে পরে ১৫ বছর রাশিয়ায় থেকে একটি ডিপ্লোমা সনদ জোগাড় করেন। এর পর দেশে ফিরে এমবিবিএস চিকিৎসক পরিচয়ে সব ধরনের অস্ত্রপচারসহ নানা প্রকার চিকিৎসা দিতে শুরু করেন। তার ভুল অস্ত্রোপচারে অসংখ্য রোগী মারা গেছেন, আজীবনের জন্য পঙুত্ব বরনসহ জটিল রোগে ভুগে অনেকেই আজ মৃত্যু পথযাত্রী।
২০০৫ সালে নিজ এলাকা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের চিকিৎসক হিসেবে থাকা অবস্থায় ইমামুল নামে এক রোগীর খাদ্যনালিতে অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে নাড়ি কেটে গেলে তা ঠিক করতে পর পর ৭ বার অস্ত্রপাচারের এক পর্যায়ে রোগীর পেটের ক্ষতস্থানে পলিথিন দিয়ে বেঁধে দেন মাছুদুল হক। খাদ্যনালী মূত্রনালি কেটে ফেলায় পলিথিন ব্যাবহার করেন এই অপচিকিৎসক, পরে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে  চিকিৎসকরা পুনরায় অস্ত্রোপচার করে ওই পলিথিন উদ্ধার করেন। এর পর থেকে এলাকায় মাছুদুল হককে পলিথিন ডাক্তার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মামলা হলে এক বছর তিন মাস কারাভোগের পর উক্ত ভুক্তভোগী পরিবারসহ সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে অত্র এলাকায় চিকিৎসা প্রদান না করার শর্তে এলাকা ত্যাগ করেন তিনি। জামিনে মুক্ত হয়ে ২০০৬ সালে ড্যাবের সদস্য পদ নেন ও বিএমডিএস চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধিত হন মাসুদুল হক। যার নম্বর-এ-৪৩২১৪। এই নিবন্ধনের পর তিনি এলাকা ছেড়ে মাগুরায় এসে মাগুরা ডায়াবেটিস হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। এখনো সেখানেই কর্মরত আছেন এই মাসুদুল হক।
পাশাপাশি মাগুরায় জাহান ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ও  বিগত সময়ের অপকর্মে উপার্জিত অর্থে মাগুরা সদর হাসপাতালের পূর্বদিকে ১০তলা ভবন নির্মাণ করেন। সেখানে তৈরি করেছেন নিজস্ব প্রাইভেট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। সেখানে সব ধরনের রোগীর অস্ত্রোপচার করছেন তিনি। এমন কোন অস্ত্রপচার নেই তিনি করছেন না। তার ভুল অস্ত্রপচারে অগনিত মানুষ  মারা  যাওয়াসহ বহু মানুষ গুরুত্বর অসুস্থ’ হয়ে পড় রয়েছে। এ সকল ঘটনায় মাঝেমধ্যে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন অভিযোগ উঠলে তার নিজের টাকায় পোষা পেশিশক্তি ও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে প্রতিবারই পার পেয়ে যান তিনি। অথচ মাসুদের অপ চিকিৎসার শিকার হয়ে শুধুমাত্র গত ২ বছরে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী গ্রামের কাজল বেগম, শ্রীপুরের নলখোলা গ্রামের সালমা বেগমসহ অনেক প্রসুতি মারা গেছেন। ঝিনাইদহের হাট গোপালপুর গ্রামের মিতু রানী সিজারের সময় অপারেশনের জরায়ু নাড়ি কেটে সেই স্থানে ইনফেকশান থেকে জটিল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আজ মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। এছাড়া মাগুরা সদরের শান্তিপাড়া গ্রামের দরিদ্র ভ্যান চালক সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিসহ অনেকে তার কাছে অর্থোপেডিক সমস্যায় শরীরে অস্ত্রপচার করে আজ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
ক্লিনিক মালিক সমিতির অভিযোগ, ২০১২ সাল  থেকে শুরু করে বিগত ৭ বছরে তারা মাসুদুল হকের ভুয়া চিকিৎসক পরিচয় তুলে কতৃপক্ষ বরাবর একাধিক চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু’  কোন ফল হয়নি। বরং ডাক্তার মাসুদুল হকের অপচিকিৎসার ব্যাপ্তি ক্রমশ বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.