এখন বড় প্রয়োজন ঐক্য ঐক্য ঐক্য : ফখরুল

‘স্বৈরশাসক’ হটাতে জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, যারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চায়, তাদের পরাজিত করতে হবে। সে জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য ঐক্য ঐক্য।

আজ বুধবার বিকেলে এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব এই আহ্বান জানান। রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে নির্যাতিতদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস-২০১৯ উপলক্ষে ‘নীরবতাও নির্যাতনের কারণ হতে পারে’ শীর্ষক এই সেমিনার হয়। সেমিনারের শুরুতে বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘রাইট টু লাইভ’ উপস্থাপন করা হয়। মানবাধিকার ডেস্কের প্রতিবেদন তুলে ধরেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের প্রধান দাবি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি। এর পরের দাবি হচ্ছে, অবিলম্বে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।’

‘আমাদের জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে, রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের যাঁরা বুদ্ধিজীবী আছেন, বিভিন্ন সংগঠনে আছেন, মানবাধিকারে কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে ঐক্যবদ্ধ শক্তি দিয়ে এদেরকে পরাজিত করতে হবে। আমাদের ভাইয়েরা-বোনেরা যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁরা বারবার এ কথা বলছেন, “আমরা নির্যাতিত হয়েছি কিন্তু আমরা মানসিক দিক দিয়ে পরাজিত হইনি। আমরা চাই যে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদেরকে পরাজিত করব। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা এদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হব”।’

গত এক দশকে বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই দেশে বিগত এক যুগেরও ওপরে অত্যন্ত সুপরিকল্পতভাবে সচেতনভাবে জনগণের ওপর নির্যাতনে স্টিমরোলার চলছে। উদ্দেশ্য একটি, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করে রাখা। উদ্দেশ্য একটি, একদলীয় শাসনব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করা। বাংলাদেশে যে চিত্র আমরা দেখছি, আমাদের সকলের কাছে তা অত্যন্ত পরিচিত একটা চিত্র। ২০০৭ সালে এক-এগারোর সরকার আসার পর থেকে যে নির্যাতন এদেশে শুরু হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিরাজনৈতিকীকরণ, রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে হবে গোটা জাতিকে। আরেকটি, যাঁরা রাজনীতি করছেন, তাঁদের সমাজে হেয় মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং রাজনীতি সুন্দর মানুষদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে এবং সেটা ভয় দেখিয়ে, নির্যাতন করে, যৌন নির্যাতন করে।’

ফখরুল বলেন, ‘আজকে বিশ্বে সেই সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়া দরকার নাই তো। আমরা আমাদের দেশেই যা দেখতে পাই, আমরা নর্থ কোরিয়াতে দেখতে পাই, আমরা রাশিয়াতে দেখতে পাই, আমরা সিরিয়াতে দেখতে পাই, আফগানিস্তানে দেখতে পাই, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে দেখতে পাই। অর্থাৎ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করবার জন্যে এই নির্যাতনকে বড় হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘১২/১৩ বছর ধরে এই দেশে যা চলছে, এটা আমার মতে সাম্প্রতিককালে বিশ্বে এই ধরনের নির্যাতন নজিরবিহীন। আপনারা নির্যাতিতদের ‍মুখে শুনেছেন। এখানে বসে আছেন আমাদের ভাই-বোনেরা। ওই কোনায় এক বোন বসে আছেন, যিনি নির্বাচনের পূর্বে একটা দলের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তার চোখ দুইটি চলে গেছে, এখানে এক বোন কথা বলেছেন, তাঁর সম্ভ্রম লুন্ঠিত হয়েছে। অসংখ্য অসংখ্য চিত্র।’

‘আমাদের সামনে বড় উদাহরণ, গণতন্ত্রের মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, যিনি শুধু এই সরকারের একদলীয় শাসনের পাকাপোক্ত করবার যে চক্রান্ত, সেই চক্রান্তের কারণে তাঁকে আজকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁকে নির্যাতন করে পঙ্গু করে নির্বাসিত করা হয়েছে। আমাদের কারাগারের মধ্যে আমাদের সহকর্মী সতীর্থরা এখনো রয়েছেন। আমাদের আবদুস সালাম পিন্টু ভাই, হাবিব–উন–নবী খান সোহেল, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ইসহাক সরকার অসংখ্য অসংখ্য বন্দী হয়ে আছেন।’

‘খালেদার মুক্তি হবে শিগগিরিই’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার ইনশা আল্লাহ মুক্তি হবে। আমি আগেও বলেছি গত সাপ্তাহে বলেছিলাম, এক সাপ্তাহের মধ্যে জামিন হবে। এক সাপ্তাহের মধ্যে দুইটার জামিন হয়েছে।’

‘আরও দুটি জামিনের অপেক্ষায় আছি। ইনশাল্লাহ আমি আশা করছি, আইনের মাধ্যমে তাঁকে বের করার চেষ্টা করছি এবং করব। তিনি খুব শিগগিরই আবার আমাদের মাঝে জামিনের মাধ্যমে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসবেন এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন। তাঁরই নেতৃত্বে দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র ফিরে আসবে।’

আন্দোলনে নেতা-কর্মীদের ত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে মওদুদ বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে থাকব না, আমরা পিছিয়ে পড়ব না, যতই অত্যাচার-নির্যাতন হোক। আমাদের ওপরে অনেক অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, ১০ বছর যাবৎ আমরা নিপীড়িত। আজকে আমাদের নেত্রী একটা মিথ্যা ভুয়া মামলায় ১ বছর ৫ মাস জেলখানায় আছেন, নির্যাতিত অবস্থায় আছেন।’

‘আমি মনে করি, এত নিপীড়ন-নির্যাতনের পরও বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভবপর হবে না। আগামী শত বছরের জন্য বিএনপিকে এই সরকার অত্যাচার-নিপীড়ন করে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। এখানে দেখেছেন নির্যাতিতদের পা চলে গেছে, হাত-পা চলে গেছে, পঙ্গু হয়ে গেছে, কিন্তু তারপরও তারা বিএনপির কথা বলছে। এরা কোনো দিন আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন করবে না।’

দলের মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে ফারজানা শারমিন, জাহেদুল আলম হিটো ও জুয়েল মণ্ডলের পরিচালনায় সেমিনারে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বক্তব্য দেন।

বিগত বছর নির্যাতিত নোয়াখালীর সুবর্ণচরের পারুল বেগম, সিরাজগঞ্জের মেরিনা মেরী, ময়মনসিংহের কক নুরুজ্জামান চান, রাজশাহীর দুর্গাপুরের মোশতাক আহমেদ, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইয়াসিন, ঢাকার আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, আকরাম হোসেন, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখেরা বর্তমান সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র কর্মীদের নির্মমতায় নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন।

নরসিংদীর তানজিরুল হক লিমনকে হুইল চেয়ারে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসার পর তার অবস্থা তুলে ধরেন তা মা মমতাজ বেগম।

অনুষ্ঠানে বিএনপির সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, জয়নাল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, হাবিবুর রহমান হাবিব, মজিবুর রহমান সারোয়ার, খায়রুল কবির খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, শামা ওবায়েদ, শিরিন সুলতানা, এবিএম মোশাররফ হোসেন, শামীমুর রহমান শামীম, হারুনুর রশীদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, মীর হেলালউদ্দিন, কাজী আবুল বাশার, আনোয়ার হোসেইন, মোরতাজুল করীম বাদরু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, আবুল কালাম আজাদ, শাহ নেছারুল হক, রাজীব আহসান, আকরামুল হাসান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান, ইউএনডিপিসহ কয়েকটি দেশের কুটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.