প্রধানমন্ত্রী না চাইলে দায়িত্বে থাকব না

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, অক্টোবরেই দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলন। দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন। তিনি না চাইলে আমি এ পদে থাকব না। তিনি যেখানে রাখবেন, সেখানেই কাজ করব।

মন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সামাজিক অপরাধ বেড়েছে। অপরাধ করে রাজনৈতিক নেতার আশ্রয় নিচ্ছে। তবে যারাই অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে তাদের বিরুদ্ধেই সাংগঠনিকসহ সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি।

গত সোমবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলন, সামাজিক অপরাধ, বিএনপির রাজনীতি, ১৪-দলীয় জোটের অসন্তোষসহ নানা প্রসঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বৃদ্ধি পেয়েছে-বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বিশাল রাজনৈতিক দল। এ দলে কোন্দল থাকতেই পারে। একটি পরিবারেও তো কলহ থাকে। সেখানে এত বড় একটি রাজনৈতিক দল, অন্যদিকে সাড়ে দশ বছর একটানা ক্ষমতায়। তবে দেখতে হবে সেটা সীমা ছাড়িয়ে গেছে কিনা? তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এমন একটি দল, যখন বিরোধী দলে থাকে, তখন আদর্শিক চর্চা বেশি হয়। আর যখন সরকারে আসে, তখন অনেক ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে হারিয়ে যায়। আবার দলে সুবিধাবাদীরা ঢুকে পড়ে। আবার আমরা যারা এমপি-মন্ত্রী এবং যারা দলের পদে আছেন, তাদের মধ্যে নিজ নিজ বলয় গড়ে ওঠে। এমপি-মন্ত্রীদের প্রভাব একটু বেশি হয়। কারণ তাদের হাতে ক্ষমতা থাকে। ফলে কোন্দল মাথা চারা দিয়ে উঠছে। এ বিষয়গুলো আমরা শক্তহাতে দমন করতে যাচ্ছি। তিনি বলেন, নিজের বলয় ভারী করতে বা নিজস্ব এজেন্ডা দলে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দলের ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নিব না। দলের দুর্দিনের কর্মীদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যারা করে তাদের কঠোর হস্তে দমন করব। তিনি বলেন, উপজেলায় ও ইউনিয়নে কে বিদ্রোহ করল-এটা বড় কথা নয়। বিদ্রোহী ব্যক্তির চেয়ে এই বিদ্রোহীকে কে মদদ দিল? কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সে চলে? দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সাহস যোগাল কে? সে যত বড় এমপি-মন্ত্রী ও নেতাই হোক না কেন, একচুল পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।

তাহলে কি দলীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের শাস্তি আসছে-জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু বহিষ্কারই সমাধান নয়। এমপিদের আগামীতে মনোনয়ন বঞ্চিত করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দলের কাউন্সিলে পদ-পদবি চান, সেখানে তাকে বঞ্চিত করা হবে। বিশেষ করে তিনি সরকারি ও দলীয় যেসব সুযোগ-সুবিধা নেবেন বা প্রত্যাশী তাকে সেগুলো থেকে বঞ্চিত করা হবে। গত সাড়ে দশ বছরে আওয়ামী লীগ কি সরকারে হারিয়ে গেছে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের দলের নেতৃত্বে আছেন শেখ হাসিনা। তিনি দলের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয়। তার অবস্থান অনেক ওপরে। নিজের দক্ষতা, সততা, মেধা ও কর্মযোগ্যতা দিয়ে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা যতদিন এই দলের নেতৃত্বে আছেন, ততদিন পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেন, এ দলে তা উপেক্ষা করার মতো কেউ নেই। তবে হ্যাঁ-এ কথা সত্য যে, দল ক্ষমতায় থাকলে সরকারে হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। আমরা এগুলো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। দল সরকারে একেবারে হারিয়ে গেছে এমনটি ঠিক নয়।

আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ প্রসঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে সদস্য সংগ্রহ করছি। কারণ ২০০৮ এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনেও তরুণরা আমাদের নির্বাচিত করেছে। তরুণ ও নারী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা পথ চলতে চাই। সে কারণে সদস্য সংগ্রহ অভিযানে তরুণদের প্রাধান্য দিচ্ছি। আর জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারবে না। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ইনাম আহমেদ চৌধুরী তো সাম্প্রদায়িক শক্তি বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ছিলেন না। তার ভাই ফারুক চৌধুরী আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ছিলেন। ইনাম আহমেদ রাজনীতির কারণে ভিন্ন মেরুতে ছিলেন। তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চান, আমরাও সায় দিয়েছি। তার মেধা, অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করেছি। এটা নিন্দনীয় কোনো বিষয় নয়।

বিএনপি সময়োপযোগী রাজনীতি খুঁজতে না পেরে কি হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন- জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপির বড় ভুল স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করা। এই দলটির সঙ্গে থাকার কারণেই বিএনপির প্রথম ব্যর্থতা। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতি, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করা। দুর্নীতির মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন কারাভোগ করছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পলাতক আসামি। এসব ভুল রাজনীতির কারণে বিএনপি সংকুচিত হয়ে তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতির মাঠে কি শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব মনে করছেন- জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দল আবশ্যক। বিরোধী দলবিহীন গণতান্ত্রিক রাজনীতি চিন্তা করা যায় না। সংসদে আমাদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। কিন্তু সবাই মনে করে বিএনপিই আমাদের বিরোধী দল। আমরাও চাই বিরোধী দল শক্তি অর্জন করুক। কিন্তু গত সংসদ নির্বাচনে তারা মনোনয়ন বাণিজ্য না করলে, স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের মনোনয়ন না দিলে হয়তো নির্বাচনে ফলাফল আরও ভালো করতে পারত।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী- জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশবাসী যতটা খালেদা জিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে চিন্তিত, খালেদা জিয়া নিজে তার রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ততটা চিন্তিত নন। তিনি চিন্তিত তারেক রহমানকে নিয়ে। তাঁর বয়স হয়েছে তাই ভবিষ্যৎ রাজনীতিটা তারেক রহমানের হাতে দিয়ে যেতে চান।

আওয়ামী লীগের সম্মেলন কবে এবং বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী অক্টোবরে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন। ১২ জুলাই দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক আছে। সেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। আর সম্মেলন মানেই পরিবর্তন। আমরা নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করব। নবীনের শক্তি ও প্রবীণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দলকে আরও গতিশীল, শক্তিশালী ও জনপ্রিয় করে গড়ে তুলতে চাই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের দলের নেতৃত্ব সাজাবেন দলীয় সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কাউন্সিলরা তাকে সেই ক্ষমতা দিয়ে থাকেন। তিনি যেভাবেই চাইবেন, সেভাবেই দলে পরিবর্তন আসবে।

মন্ত্রী না আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক-কোনটা বেশি উপভোগ করছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, দুটো দায়িত্বই আমাকে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন। আমি তো সরকারের মন্ত্রী। দলের সাধারণ সম্পাদক। মন্ত্রণালয়ও চালাচ্ছি, দলও দেখছি। মন্ত্রণালয়ের সব কাজ আমার নখদর্পণে। আবার দিনে কম করে হলেও দু-বার পার্টি অফিসে বসছি। কোনো সমস্যা তো দেখছি না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে অনেক যোগ্য নেতা আছেন। আর যে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সে দলে যোগ্য লোকের অভাব হয় না। হবেও না।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ সম্প্রতি ১৪-দলীয় জোটে অসন্তোষ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ১৪-দলীয় জোট একটা আদর্শিক জোট। এ জোটে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল আছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেককেই পাওয়া না পাওয়া বিষয়ে ভাবাবে। আবার মান অভিমানও থাকবে। তবে আদর্শগতভাবে জোটে ভাঙনের সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.