মশা নিধনে বছর বছর বাজেট বাড়লেও সুফল মিলছে না

রাজধানীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরজুড়ে দুই সিটি করপোরেশন থেকে মশার ওষুধ ছিটানো হলেও তেমন কোনো ফল পায়নি নগরবাসী। বরং হয়েছে উলটোটা। গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার ভয়াবহ আকারে বেড়েছে ডেঙ্গু। ঘটছে মৃত্যুও। অথচ মশা প্রতিরোধে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে দুই সিটি করপোরেশন। মশা নিধনের বাজেট বছর বছর বাড়লেও মশা মোটেই কমেনি। গত পাঁচ বছরে দুই সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে বাজেট বেড়েছে আড়াই গুণ। কিন্তু মশার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পায়নি রাজধানীবাসী।

জানা যায়, রাজধানীতে মশক নিধনের জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এর জন্য দুই সিটিতে অর্ধশত কোটি টাকা খরচ করা হয়। এ খাতে গত পাঁচ বছরে দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বরাদ্দ বেড়েছে ১৩৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বরাদ্দ বেড়েছে ১২২ দশমিক ২২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেনি দুই সিটি করপোরেশন। তবে মশক নিধনে এ বছর বাজেট আরো বাড়বে হবে বলে জানা গেছে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মশা নিধনে বরাদ্দ ছিল ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সামান্য কমে দক্ষিণ সিটিতে বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, উত্তর সিটিতে ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। পরের বছর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতে দক্ষিণ সিটিতে বরাদ্দ হয় ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, উত্তর সিটিতে ২০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মশক নিধন খাতে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন করেছে ২১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকার মশার ওষুধ কিনে ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আর চলতি অর্থবছরে ২৮ কোটি টাকার ওষুধ কেনার কথা ভাবছে। অন্যদিকে ডিএনসিসিতে গত অর্থবছরে ১৮ কোটি টাকার ওষুধ কিনেছে। চলতি বছরের ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণে এ খাতে আরো কয়েক কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হবে বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের হিসাব মতে, ২০১৫ সালে দেশে ৩ হাজার ১৬২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৪৮ জন। এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্বয়ং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য টিমই মাঠ পর্যায়ে গত এক সপ্তাহে সংস্থাটির পাঁচটি অঞ্চলে ৩ হাজার ৫২৬ রোগীর চিকিত্সা দিয়েছেন। ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে ১ হাজার ৫৩১ জনই ছিল জ্বরের রোগী।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মাহমুদ খান বলেন, বাজেট বাড়ানো হলেও নাগরিকরা সেবা পাচ্ছেন না। উদ্বেগের বিষয় হলো—সরকারি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তাতে মশা মরছে না। অকার্যকর মশার ওষুধের কারণে যতই বাজেট বাড়ানো হোক কোনো কাজে আসবে না। এর মধ্যে দুর্নীতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আন্তর্জাতিক উদ্রাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত কীটনাশক দিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ভাইরাস বাহক অ্যাডিস মশা মরছে না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মে মাস পর্যন্ত রাজধানীর ৮টি এলাকায় অ্যাডিস মশা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ঢাকা শহরের অ্যাডিস মশা ওষুধ প্রতিরোধী। বর্তমান ওষুধে তারা মরে না। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, বর্তমান মশার ওষুধ কার্যকর নয় বলে যেটা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়।

বাংলাদেশের আবহাওয়ায় জুন-জুলাই ডেঙ্গু জীবাণুবাহী অ্যাডিস মশার প্রজনন মৌসুম। এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে যায়। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে অ্যাডিস মশার জন্ম হয়। রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের ৯ শতাধিক কর্মী প্রতিদিন কাজ করছেন। এতে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত আট জন করে শ্রমিক কাজ করার কথা। কিন্তু এলাকায় এসব লোকের দেখা পান না নগরবাসী।

নগরবাসী বলছেন, ঐ দুই মাসেই নয়, এবার বছর জুড়েই মশার উত্পাতে অতিষ্ঠ তারা। এমন অবস্থা যে, দিনের বেলায়ও বাসা-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, অফিস সব জায়গায় মশার উত্পাত। অথচ বর্ষা শুরুর আগে মশা নিধনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি সিটি করপোরেশন। মশক নিধনের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের দেখা যায় কালেভদ্রে। কোনো বড়ো প্রোগ্রাম না থাকলে মশক নিধনের কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

মাঠ পর্যায়ে মশক নিধনের সঙ্গে যুক্ত সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মীর সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, ওষুধে মশা মরে না, কথা সত্য। আমরা মাঠ পর্যায় কাজ করি বলে আমরা জানি। এজন্য অনেক সময় এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়তে হয় আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.