গণপিটুনির ঘটনায় ৩১ মামলা, গ্রেফতার ১০৩

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, গুজব রটালে তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে। জঙ্গিবাদ ও মাদকের মতো গুজবের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে রয়েছি আমরা। তিনি জানান, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর ঘটনায় সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিদের লিংক পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি জানান, গুজব প্রতিরোধে আজ বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে ‘সচেতনতা সপ্তাহ’ শুরু হচ্ছে। এই লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যরা গ্রাম, পাড়া, মহল্লা থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক প্রচার কাজ চালাবেন। তারা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিশুদের এ ব্যাপারে সচেতন করতে কাজ করবেন।

পুলিশ প্রধান বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল সুপরিকল্পিতভাবে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রথম যে পোস্টটি আমাদের নজরে আসে সেটি ছিল দুবাই থেকে। দুবাইয়ের এক ব্যক্তি এই পোস্টটি করেন। গুজব ও গণপিটুনির ঘটনায় ৩১টি মামলায় এ পর্যন্ত ১০৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য আন্দোলনসহ নানা উপায় অবলম্বন করে ব্যর্থ হয়ে এখন গুজব ছড়াচ্ছে। তারা দেশের বাইরে থেকেও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে। গুজবের ঘটনায় এ পর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলের লিংক পেয়েছি। জড়িতদের প্রেফাইল তৈরির কাজ চলছে।

আইজিপি আরো বলেন, মাথাকাটার গুজব ছড়ানোর কাজে ব্যবহূত ৬০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ২৫টি ইউটিউব লিংক এবং ১০টি ওয়েব পোর্টাল বন্ধ করা হয়েছে। এ সব ফেসবুক ও ইউটিউব লিংকের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছিল। গুজবের ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে তাদের কেউই ছেলেধরা ছিল না।

অনেকে না বুঝেই এগুলো শেয়ার করছে, মন্তব্য করছে। অথচ আমরা এই গণপিটুনির ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখলাম, এতে যে আটজন মানুষ মারা গেছে তাদের সবাই নিরপরাধ।

নেত্রকোনায় এক শিশুর মাথাকাটায় গণপিটুনির ঘটনায় নিহত ব্যক্তি রবিন ছিল একজন মাদকাসক্ত। সে ঐ শিশুটিকে মারার আগে তাকে বলাত্কার করে। আমরা তদন্ত করে জেনেছি, সে মাদকাসক্ত। সে কয়েক বার তার স্ত্রীর গলা কাটতে চেয়েছিল। আমরা নিহত শিশুর সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করেছি। পারিপার্শ্বিক ঘটনার বিশ্লেষণে আমরা বলতে পারি যে, শিশুটিকে রবিন প্রথমে বলাত্কারের চেষ্টা করে, এরপর শিশুটি এর প্রতিবাদ করতে গেলে সে তাকে হত্যা করে।

বাড্ডায় নারী নিহতের ঘটনাটিও ছেলেধরা ছিল না। ঐ নারী তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তির জন্য গিয়েছিল। একইভাবে যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জের ঘটনাটিও ব্যক্তিগত বাগবিতণ্ডায় ‘ছেলেধরা’ বলে চিত্কারের কারণে ঘটেছে।

আইজিপি বলেন, আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা দেখেছি প্রতিটি ঘটনায় ইতিপূর্বেও গুজবকে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছে। সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ খুব সহজ সরল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু পোস্ট হলে, আর সেটি যদি নেগেটিভ হয় তাহলে খুব দ্রুত শত শত লাইক-শেয়ারে ভরে যায়। এই ঘটনাগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। প্রতি জেলার এসপি, মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাট-বাজারে ছোটো ছোটো আকারে সভা করেছে। প্রতিটি স্কুল-মাদ্রাসার বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সাদা পোশাকে পুলিশ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আইজিপি বলেন, দেশবাসীর উদ্দেশে বলতে চাই, এই ঘটনাটি স্রেফ গুজব। পুলিশ যে কোনো প্রয়োজনে আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। আপনারা কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। আমরা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছি। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে ভিকটিম না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছি। গুজব বন্ধে আজ বৃহস্পতিবার থেকে আমরা সারাদেশে সচেতনতা সপ্তাহ ঘোষণা করছি। এই সচেতনতা সপ্তাহে পুলিশের প্রতিটি সদস্য হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় যাবেন। অভিভাবক শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলবেন। এছাড়াও শুক্রবার জুমা নামাজের আগে প্রতিটি মসজিদের ইমামদের এ বিষয়ে কথা বলতে আহ্বান জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে র?্যাবের ডিজি, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সদর দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.