জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্ম ও জীবন ( ৬ষ্ঠ পর্ব) 

প্রদীপ কুমার দেবনাথ

বাংলাদেশের শাসন ( নতুন রাষ্ট্র পূণর্গঠন সংগ্রাম)  
অস্থায়ী সরকার গঠনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অল্পদিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০-এ পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার জন্য নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা নতুন রাষ্ট্রের প্রথম সংসদ গঠন করেন। মুক্তিবাহিনী, আধাসামরিক, বেসামরিক ( বাছাইকৃত) এবং অন্যান্য মিলিশিয়াদের নিয়ে নতুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠিত হয়। তারপর পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব হাতে নেন এবং  তারই অনুরোধক্রমে ১৭ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ত্যাগ করে।
তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। টাইম ম্যাগাজিন ইউএসএ ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২ ভাষায়
  মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর বিশ্বব্যাংকের পরিদর্শকদের একটি বিশেষ টিম কিছু শহর প্রদক্ষিণ করে বলেছিলেন, ‘ওগুলোকে দেখতে ভুতুড়ে নগরী মনে হয়।’ এরপর থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এহেন ধ্বংসলীলার ক্ষান্তি নেই। ৬০ লাখ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ২৪ লাখ কৃষক পরিবারের কাছে জমি চাষের মতো গরু বা উপকরণও নেই।  পরিবহনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পুল-কালভার্টের চিহ্নও নেই এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগেও অনেক বাধাবিঘ্ন। এক মাস আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত দেশের ওপর নির্বিচার বলাৎকার চলেছে। যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো (কার্যত প্রতিটি ব্যবসা ক্ষেত্রই পাকিস্তানিদের দখলে ছিল) তাদের সব অর্থ-সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেয়। যুদ্ধ শেষে চট্টগ্রামে পাকিস্তান বিমানের অ্যাকাউন্টে মাত্র ১১৭ রুপি জমা পাওয়া গিয়েছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাংক নোট ও কয়েনগুলো ধ্বংস করে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ নগদ টাকার প্রকট সংকটে পড়ে। রাস্তা থেকে প্রাইভেটকারগুলো তুলে নেওয়া হয়, গাড়ির ডিলারদের কাছে থাকা গাড়িগুলো নিয়ে নেওয়া হয় এবং এগুলো নৌবন্দর বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেওয়া হয়। এছাড়া মূল্যবান সবকিছুই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ধ্বংস করে একদম শূন্য ধূলিময় মরুভূমি করে দিয়ে যায় এই বাংলাদেশকে।
কার্যত অর্থ সম্পদ বিহীন একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। ভাঙ্গা ডেরা, শূন্য গোয়াল, শূন্য গোলা, শূন্য ব্যাংক, এলোমেলো  সমগ্র প্রতিষ্ঠানের পাহাড়সম বোঝা নিয়ে বঙ্গবন্ধু এর প্রধানমন্ত্রী হন। সহায় সম্বলহীন রাষ্ট্রের প্রাথমিক সমস্যা নিরসনে প্রাণপণে কাজে লেগে যান প্রথম থেকেই। বঙ্গবন্ধুর প্রেরণায় খালি পেটে ভঙ্গুর, ছিন্নভিন্ন রাষ্ট্রটিকে বাঁচাতে প্রায় ৭ কোটি মানুষ যোগ্যতা অনুসারে কাজে লেগে যান। আস্তে আস্তে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, সামরিক ক্ষেত্রসহ সকল ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। গঠন করেন আলাদা আলাদা বিভাগ। দেশের উপার্জিত অর্থে ছোট ছোট ফান্ড সহ বহির্বিশ্ব থেকে অনুদান, সাহায্য, ঋণ ইত্যাদি নিয়ে মাত্র ৬ মাসে বাসযোগ্য একটা দেশে উপনীত করেন বাংলাদেশকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি বেতনের বিধান করেন। সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে দক্ষ সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেন আমাদের বাংলাদেশের সিংহপুরুষ জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান।
কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বহির্বিশ্বের প্রাপ্ত অর্থের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করেন এই কৃষিক্ষেত্রে।
তাছাড়া তিনি ভালভাবেই অনুধাবন করেছিলেন যে, শিক্ষিত মানবগোষ্ঠী ছাড়া দেশের উন্নয়ন কখনও সম্ভব নয়। তাই তিনি ৪২০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একযোগে জাতীয়করণ করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.