রাণীনগর-আত্রাইয়ে পানির দরে চামড়া

কাজী আনিছুর রহমান,রাণীনগর (নওগাঁ) : সারা দেশের ন্যায় নওগাঁর রাণীনগর ও আত্রাইয়ে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এক প্যাকেট ব্যানসন সিকারেটের চেয়েও কম। প্রশাসনের নেই কোন মনিটরিং। সাধারণ মানুষ বলছে , ইয়াতিমদের হক মেরে দিয়েছে মধ্যস্বত্ত্বভোগী চামড়া ব্যবসায়ীরা। ঈদের দিন রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। সরকারের নির্ধারিত মূল্য তো দুরের কথা এর আশেপাশের মূল্যও পাচ্ছেন না বিক্রেতারা। অনেকে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে স্থানীয় মসজিদ মাদ্রাসায় দান করে দিচ্ছেন। লক্ষাধিক টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র দুই’শ থেকে ছয়’শ টাকায়। ছোট গরুর চামড়ার কেউ সহজে দামই করতে চায়নি। আর ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ৫০ টাকায়। এই মূল্য অবনতির বড় শিকার হয়েছে দুঃস্থ মানুষ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বছরের বৃহৎ এই আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মাথায় হাত পড়েছে।

চামড়ার চাহিদা না থাকার অজুহাতে এবার ন্যায্যমূল্য দেয়নি এখানকার ব্যবসায়ীরা। ফলে কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন রাণীনগর-আত্রাই উপজেলাবাসী। এ কারণে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে পানির দরে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এবার কারসাজি করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ছলচাতুরি করে কমমূল্যে চামড়া কেনার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছে একটি সিন্ডিকেট চক্র। এবার দুই উপজেলায় কুরবানির চামড়ার দাম ছিল গেল কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানার কমিটির কাছে দান করা চামড়াগুলোর দামও ওঠেনি ভালো।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশি দরে চামড়া কিনে প্রতিবছরই তাদের লোকসান গুণতে হয়। এ জন্য এবার তারা বেশ ‘সতর্ক’ হয়েই চামড়া কিনেছেন। গতবছর ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট চামড়া ৪০ টাকা ও খাসির চামড়া সারা দেশেই ২২ টাকা দরে কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। এবারও তারা একই দর চূড়ান্ত করে নিয়েছিলেন সরকারের কাছ থেকে। অন্য বছর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে চামড়া বিক্রি হলেও এবার তা হয়নি।

দুই উপজেলা জুড়ে এবার ফড়িয়াদেরও দৌরাত্ম্য ছিল অনেক কম। ফলে চামড়া কেনার সময় ব্যবসায়ীরা এবার বেমালুম চেপে গিয়েছেন সরকার নির্ধারিত দাম। কোথাও কোথাও চামড়া বিক্রি হয়েছে নির্ধারিত দামের চেয়েও কম টাকায়। গত কয়েকটি কুরবানির ঈদে চামড়া এতো কম মূল্যে বিক্রি হতে দেখা যায়নি। অন্য বছরগুলোর তুলনায় এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীর দাপটও ছিল কম। ফলে চামড়ার বাজারে ‘রাজত্ব’ করেছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই। তারা চামড়া বিক্রেতাদের বলেছেন, গত বছরের চামড়ার প্রায় অর্ধেক এখনো রয়ে গেছে ঢাকার ট্যানারিগুলোতে। তাছাড়া ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করতে গিয়েও টালমাটাল ব্যবসায়ীরা। ফলে নতুন করে চামড়া কেনার আগ্রহ ছিলো না তাদের। তারা চামড়া কিনছেন ঝুঁকি নিয়ে। ট্যানারি মালিকরা চামড়া না নিলে তারা লোকসান গুণবেন। এ জন্য তারা চামড়া বেশি দামে কিনতে পারছেন না।

রাণীনগর-আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের একাধিক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছর চামড়া ব্যবসা করে মহাজনের কাছে তাদের লাখ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। তাই এবার সতর্কতার সঙ্গে চামড়া কিনেছেন। তারা আরো বলেন গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে কিনেছেন।
কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম বিষয়ে রাণীনগর উপজেলার বাসিন্দা কাজী শাখাওয়াৎ জানান, চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ৬০০ টাকা। একই এলাকার এলাহি বক্্র বলেন, আমি ছাগল কোরবানি দিয়েছিলাম আর চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ১০ টাকায়।
আত্রাই উপজেলার ভরমাধাইমুড়ি সিদ্দিকিয়া দারুল উলুম কাওমি মাদ্রার শিক্ষক মতিউর রহমান জানান, এবার চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণে অনেক গ্রামে ছাগল-ভেড়ার চামড়া কেউ কিনতেও পর্যন্ত যায়নি। অনেক কুরবানিদাতা পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছে । আবার কেউ কেউ নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে।
এদিকে চামড়ার দাম কম হওয়ায় কোরবানিদাতারা হতাশ হন। তারা মন্তব্য করেন, মাত্র কয়েক বছর আগে একটি গরুর চামড়া দুই হাজার থেকে আড়াই হাজারে এবং ছাগলের চামড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পশুর মূল্য অনেক বেড়ে গেলেও চামড়ার দাম নেই বললেই চলে। এতে বিভিন্ন মাদ্রাসার এতিম শিশুদের হক নষ্ট করা হয়েছে। তারা এ জন্য চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, গরিবের হক নষ্ট করে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন।

উপজেলার সচেতন মহল মনেকরছেন, সিন্ডিকেট চক্র সরকার নির্ধারিত দরের তোয়াক্কা না করে নামমাত্র দরে চামড়া বিক্রি করতে জনগণকে বাধ্য করেছে। এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরদাবি জানান। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.