সিটি ও পৌর নির্বাচনের পদধ্বনি এবং ইসির বড় হুজুরদের আমলনামায় এসব কী

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু,লেখক কলামিষ্ট : ঈদ মুসলমানদের মহাউৎসব ও আনন্দের দিন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন, ভোট অনুষ্ঠান, দেশের ভোটার ও জনগণের জন্য এ দিনটি আনন্দ ও উৎসবের দিন হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটাধিকারের পরিবর্তে যদি ভোট কেন্দ্র দখল, জোর করে ব্যালট পেপারে সিল, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও ভোটে যদি কারচুপি করা হয় তবে তা আনন্দ উৎসবের স্থলে বিষাদ ও দুঃখবেদনারই নামান্তর। যাতে গণতন্ত্র বিকাশের পরিবর্তে জনমনে আগণতন্ত্রই প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে।

আব্রাহাম লিংকনের উক্তিতে গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হচ্ছে, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক সরকার। অর্থাৎ উবসড়পৎধপু ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব. আর এ প্রবিধানের বাহিরে যদি কোনো কিছু হয়ে থাকে তবে তা গণতন্ত্র হরণ বা ভোটাধিকারের পরিবর্তে অগণতন্ত্রের পথকে চালিত করে থাকে বলে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অভিমত।

পাকিস্তানের এক নায়কদের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কারণেই তাদের বিরুদ্ধে ৫২, ৬২, ৬৬ ও ৬৯ সালে গণআন্দোলন, সংগ্রাম ও ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়। সেদিন স্লোগান ছিল, বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কর। তখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত আকাশ বাতাশ বিদীর্ন করে সমস্বরে এই স্লোগান উচ্চারিত হয়ে থাকে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের প্রত্যাশা ছিল একটাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। স্বাধীন দেশে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছ, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ৭৩, ৮৬, ৮৮, ৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনসহ সিটি, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের ইতিহাস ও হাল হকিকত কমবেশী সবারই জানা। যে কারণে এ নিবন্ধে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যাওয়ার তেমন প্রয়োজন মনে করি নাই। এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কাজী রকিব ও নূরুল হুদা কমিশন এবং তারও আগে ও পরে সাধারণ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার পর্ষদের নির্বাচন নিয়ে যা হয়েছে এসব কিছু দেশবাসীর নগত দর্পনে রয়েছে বলে এ নিবন্ধে তুলে ধরা হয়নি।
চলমান পাতা/২
পাতা: ২

পৌরসভা নির্বাচনের এখনও প্রায় ১৮ মাস সামনে রয়েছে। জানা যায়, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন অনুযায়ী পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। সে হিসেবে আগামী বছরের শুরুতেই ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটাকে উপলক্ষ করেই হয়তো তিন সিটি কর্পোরেশনসহ সারা দেশের পৌরসভাতে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিলবোর্ড, ব্যানার ও পোস্টারে একাকার করে দিয়েছে। যা ছোট বড় সকলেই দৃষ্টি কুড়িয়েছে। সম্প্রতি সড়ক পথে কুমিল্লা থেকে ঢাকা ফেরার পথে বিভিন্ন স্থানে ঈদের শুভেচ্ছার নামে যে বিল বোর্ড, ব্যানার ও পোস্টারের সমারোহ চোখে পড়েছে তা বাস্তবিকই অবাক হওয়ার কথা। অনুসন্ধ্যান করে জানা গেছে, ঈদুল আজহার শুভেচ্ছার নামে এসব কিছুই আগাম নির্বাচনের পরিচয় বার্তা।

এমনিভাবে কিশোরগঞ্জ শহরেও ঈদুল আজহার প্রাণঢালা শুভেচ্ছার মধ্য দিয়ে শফিকুল আলম শিপলুর ঈদ শুভেচ্ছার বিলবোর্ড পথচারীসহ অনেকের নজরে পড়েছে। এমনকি শহরের মহল্লায় মহল্লায় ও ঘরে ঘরে শফিকুল আলম শিপলুর ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে কর্মীবাহিনী ঈদের শুভেচ্ছা পত্র বিলিসহ তার জন্য দোয়া কামনা করছে। জানা যায়, শিপলুর দাদা ছিলেন এক সময় ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, পিতা ছিলেন সাবেক এমপি। এক চাচা ছিলেন জেল সুপার, অপর দুই চাচাদের মধ্যে একজন ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট ও সক্রিয় রাজনীতিবিদ। অপর চাচা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। শফিকুল আলম শিপলু একজন ন¤্র, ভদ্র, বিনয়ী ও সফল ব্যবসায়ী। নির্বাচনের যেহেতু অনেক সময় সামনে রয়েছে এ নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা সমীচিন মনে হয় না। দিন যতই এগিয়ে আসবে হয়তোবা আরও অনেক নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। তখন সময়ই সব কিছু বলে দিবে। তবে এ মুহুর্তে শফিকুল আলম শিপলুর প্রচারণা ও গণজাগরণ যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জানা যায়, আরও অনেকেই বসে নেই। তাই সামনে আরও কিছু দেখা ও লেখার অপেক্ষায় থাকাই শ্রেয়।

সুষ্ঠু, অবাধ, স্বচ্ছ ও কারচুপি মুক্ত নির্বাচনের পুরোধা বা মধ্যমনি হচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। দুঃখজনক হলেও সত্য দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলোর প্রচ্ছদে প্রকাশিত ৬ আগস্ট, মঙ্গলবার ২০১৯ ইং একটি সংবাদ দেখে অনেকের মতো বিব্রত হয়েছি। তাতে দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উপলক্ষে শুধু বিশেষ বক্তৃতা দেয়ার নামে দেড় কোটি টাকা পকেটে ভরেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), চার কমিশনার, সচিবসহ ৯ পদস্থ কর্মকর্তা। এর বাইরে কোর্স উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব (বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব) একাই নিয়েছেন ৪৭ লাখ টাকা। তিনি বিশেষ বক্তা হিসেবেও টাকা নিয়েছেন তবে তা কত টাকা জানা যায়নি। সূত্রে আরও জানা যায়, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন কমিশন ৬১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। আর উপজেলা নির্বাচনে প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তথ্য, তত্ত্ব, উপাখ্যান সূত্র অনুযায়ী বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দেয়ার নামে যারা টাকা নিয়েছেন তারা হলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে.এম নূরুল হুদা, চার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ও কবিতা খানম। সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, অতিরিক্ত সচিব মোখলেছুর রহমান, দুই যুগ্ম সচিব আবুল কাশেম ও কামরুল হাসান। আর উপজেলার একটি প্রশিক্ষণ থেকে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুক নিয়েছেন ১৯ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। জানা যায়, বক্তৃতা দিয়ে বিশেষ বক্তা, কোর্স উপদেষ্টা ও কোর্স পরিচালক হিসেবে তারা নিয়ে গেছে ২ কোটি টাকার বেশী। আরও জানা যায়, সংসদ নির্বাচনে প্রিসাইডিং, সহকারি প্রিজাইডিং ও পুলিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে বরাদ্দ ছিল ৪৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এই টাকা থেকে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা ভাগ করে নিয়েছেন ৯ জন বিশেষ বক্তা। এ হিসেবে প্রত্যেকের ভাগে পড়ে গড়ে ১১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ৫২০টি প্রশিক্ষণের প্রতিটিতে ৪ জন করে বিশেষ বক্তা দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে একজন অভিজ্ঞ নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, সিইসি, চার নির্বাচন কমিশনার ও চার কর্মকর্তা এভাবে সারাদেশ জুড়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালে সংসদ নির্বাচনের মতো বিশাল আয়োজনের কাজ বন্ধ রাখতে হতো। আর বক্তৃতার নামে যেভাবে টাকা লুটে নেয়া হয়েছে তাতে প্রশিক্ষণ খাতের পুরো বরাদ্দের সঠিক ব্যয়ভার নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। একজন বিজ্ঞজন মন্তব্য করে বলেছেন, ১৮ দিনে দেশের ৫২০টি স্থানে প্রতিজনে দিনে ১৪ স্থানে বক্তৃতা দেয়া শুধু অসম্ভবই নহে,
চলমান পাতা/৩
পাতা: ৩

সোনাবানের পুঁথির মতো। লক্ষ লক্ষ সৈন্য মরিল কাতারে কাতার গুনিয়া বাছিয়া দেখি মাত্র তের হাজার উক্তিরই নামান্তর বা নতুন সংস্করণ। যাক, এসব কিছু সঠিক বা বেঠিক আমার মতো অনেকেরই জানার কথা নয়। তবে যদি সঠিক হয় তবে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে দুঃখ, বেদনা ও অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে এ কথা বলা যায়, প্রথম আলোতে প্রকাশিত এ তথ্য ও সূত্র যদি সঠিক হয়ে থাকে, কোনমতেই তাদের দ্বারা আগামী সিটি কর্পোরেশন ও পৌর নির্বাচন তত্ত্বাবধান করাতো দূরের কথা সংসদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের কোনো উপনির্বাচন পরিচালনাও যথেষ্ট চিন্তা ও প্রশ্নের বিষয়।

বিশিষ্ট কলামিষ্ট ও সাবেক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা শ্রদ্ধেয় এ.কে.এম শামসুদ্দিন সম্প্রতি একটি কলামে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তৃতায় অংশ বিশেষ তুলে ধরেছেন (যুগান্তর ১৯ আগস্ট ২০১৯ ইং)। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘এত চোরের চোর, চোর কোথা থেকে যে পয়দা হয়েছে আমি জানি না। পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেছে, কিন্তু এ চোরগুলো রেখে গেছে আমার কাছে। এ চোরগুলো নিয়ে গেলে আমি বাঁচতাম’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ বক্তব্যটি যে কত সত্য আজ তা মর্মে, মর্মে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। এ প্রসঙ্গে ৭৪ সালে পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানীর একটি বক্তৃতার কথা আজও মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন ‘ভালো করে সীমান্ত পাহাড়া দাও। আমার দেশের সোনাদানা ও মূল্যবান সবকিছু মাফিয়ারা ওপারে পাচার করে দিচ্ছে। ওদের ধরে পাচায় আলকাতরা ও কপালে অমুচনীয় লাল দাগ দিয়ে চিহ্নিত কর।

নির্বাচন কমিশন দেশের একটি সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ অর্গান। তাদের বেলায় যদি এ ধরণের টাকা লোপাটের ঘটনা ওঠে আসে তবে তা দেশ, জাতি, জনগণ ও সরকারের দুর্ভাগ্য।

নির্বাচনে কে বা কাহারা বা কোন দল জয়লাভ করল বা পরাজিত হল তা বড় কথা নয়। সুষ্ঠু, অবাধ, স্বচ্ছ ও কারচুপি মুক্ত নির্বাচনের লক্ষ্যে ইসি ও সিইসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পদবীতে দুর্নীতিমুক্ত গ্রহণযোগ্য লোক, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু, অবাধ ভোটাধিকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা করে থাকে দেশের জনগণ। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, তোয়াজ, তোষন ও চাটুকারীতার ভূষন এখন শুধু উঁচু মহলেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশে এখন কম সংখ্যক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে যেখানে বিষফোঁড়ার মতো ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির খামচা লাগেনি। যা এক সময়ের কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো বিস্তার ঘটছে।