ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট হবে

অনলাইন ডেস্ক: দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ সহজ করতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘বিনিয়োগকারীদের উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে হয় তাই আমরা ইতিমধ্যে সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছি। কিছু ব্যাংক আমাদের নির্দেশ মেনে চলছে। আর কিছু ব্যাংক মানেনি।’ রোববার বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় রফতানি ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম ও এফবিসিসিআই’র সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম। স্বাগত বক্তব্য দেন রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান বেগম ফাতিমা ইয়ামিন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। সরকার এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।’

নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে গুরুত্বারোপ : অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রফতানি খাতের সম্প্রসারণ, রফতানি বহুমুখীকরণসহ নতুন বাজার খুঁজে বের করা জরুরি।

আমরা নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে কাজ করে যাচ্ছি। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কেও রফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসায়ীরাই ব্যবসা করবে, তাদের কাজে আমরা সহযোগিতা করব। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করব আমরা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের আমি একটাই অনুরোধ করব, যে শিল্প বা শিল্পাঞ্চল আপনারা গড়ে তুলবেন বা শিল্পোন্নয়ন করবেন, পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি আপনাদের গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু থেকেই করতে হবে। যেমন- খুব হার্ড কেমিক্যাল ওয়েস্ট অথবা সলিড ওয়েস্ট বা অন্যান্য লিকুইড ওয়েস্টের ব্যবস্থাপনা যদি শুরু থেকেই করেন, তাহলে আমাদের পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতা হবে এবং দেশ ও মানুষের কল্যাণ হবে।’

তিনি ব্যবসায়ীদের এদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান। প্রতিটি শিল্প এলাকায় একটি করে জলাধার রাখার দিকে নজর দেয়ার জন্যও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেন বৃষ্টির পানি সেখানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়।

যত স্থাপনা হবে, সেখানকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এই পানি ব্যবহার করা যায়। জলাধার থাকলে পরিবেশও ভালো থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী অধিক হারে বৃক্ষরোপণের পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, ‘শিল্পাঞ্চলে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করা আমাদের পরিবেশের জন্যই দরকার। আপনারা সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেবেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের রফতানি সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে। যে যেই দেশের অ্যাম্বাসেডর, সেই দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, সেই পণ্যের মধ্যে কোনটি আমাদের নিজেদের দেশে উৎপাদন করতে পারি, রফতানি করতে পারি এবং সেই সুযোগটা যাতে সৃষ্টি হয়, সেজন্য তারা কাজ করবেন এবং আমাদের পণ্যগুলো সে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরার ব্যবস্থাও তারা নেবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের চামড়াসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, আসবাবপত্র, জুয়েলারিসহ বিভিন্ন নন ট্যাডিশনাল পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, যেসব দেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার ঘটেনি, কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন, তাদের মাধ্যমে পণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে পৌঁছবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত সাড়ে ১০ বছরে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রতিটি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২০২টি দেশে প্রায় ৭৫০টি পণ্য ও সেবা রফতানি করে ৪৬ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি আয় করেছে।

এই সময়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে দেশের বাজেটের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের সর্বশেষ জিডিপির র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী বাংলাদেশ পিপিপি ভিত্তিতে বিশ্বের ৩০তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় ২য় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এখন বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, এবার দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। তার সরকারের প্রত্যাশা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির হারকে ডাবল ডিজিটে (১০ শতাংশ) নিয়ে যেত সমর্থ হবে।

তার সরকারের দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দারিদ্র্যের হার কমে এখন ২১ শতাংশ হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯০৯ ডলার। অচিরেই ২ হাজার ডলার অতিক্রম করবে এবং ২০২৩-২৪ সাল নাগাদ দারিদ্র্য ১৬-১৭ শতাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হব।’

দেশের শিল্পায়নে বিদ্যুৎকে অন্যতম চালিকাশক্তি আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন দেশের ৯৪ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।’

‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল, মাতারবাড়ী, পায়রা ও মহেশখালীতে মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের কাজ চলছে,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতে এবারের বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রফতানিতে অতিরিক্ত ১ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে গত অর্থবছরে ৩৫টি খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ অর্থবছরে আরও কিছু রফতানি পণ্যকে নগদ সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে।’

বিগত নির্বাচনে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন জোটের একতাবদ্ধ হয়ে নৌকাকে সমর্থন দেয়াকে অভূতপূর্ব আখ্যায়িত করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য আমরা বিদ্যমান কোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছি।’

তিনি বলেন, যুব সমাজ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, তাদের জন্য ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা-২০১৮ প্রণয়ন এবং ‘ই-বাণিজ্য করব, নিজের ব্যবসা গড়ব’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতা এবং শিল্প সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিসহ বিদেশি কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

দেশের রফতানি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২৮টি ক্যাটাগরিতে ৬৬টি প্রতিষ্ঠানের মাঝে জাতীয় রফতানি ট্রফি ২০১৬-১৭’র ২৯টি স্বর্ণ, ২১টি রৌপ্য এবং ১৬টি ব্রোঞ্জ ট্রফি প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড’ টানা ষষ্ঠবার শ্রেষ্ঠ রফতানিকারক হিসেবে ২০১৬-১৭ সালের রফতানি স্বর্ণ ট্রফি জয় করে।

‘জাবের অ্যান্ড জুবায়ের লিমিটেড’ ২০১৭ সালের সর্বোচ্চ রফতানি আয়ের জন্য আরও একটি স্বর্ণ ট্রফি লাভ করে। অনুষ্ঠানে রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর ভিডিওচিত্রও প্রদর্শিত হয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.