ঠাকুরগাঁওয়ে ‘নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম’ তৈরির এক নায়ক – মোকছেদ আলী,

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি,, বাংলাদেশের প্রথম ‘নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম’তৈরির এক নায়কের নাম মোকছেদ আলী। এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর  ঠাকুরগাঁও জেলার তরুণ-যুবারা ঝাঁপিয়ে পড়ে আরেকটি যুদ্ধে। সেটি সাক্ষরতার যুদ্ধ, নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম গড়ে তোলার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ঠাকুরগাঁও  জেলার সদর উপজেলার কচুবাড়ি-কৃষ্টপুর গ্রাম দেশের প্রথম নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই তরুণ যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেন মোকছেদ আলী , আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস প্রতি বছর আসে-যায়। কিন্তু সাক্ষরতা আন্দোলনের নায়ক রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ঠাকুরগাঁও জেলার মোকছেদ আলীর পরিবারের খোঁজ নেয় না কেউ। মোকছেদ আলীর একমাত্র ছেলে আল-আমিন ১৯৯৯ সালে আলিম পাস করার পর চাকরি না পেয়ে তিনি এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। অনেক চেষ্টার পরও আল-আমিন নিজের চাকরি যোগাতে যেমন ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনি একইভাবে ব্যর্থ হয়েছেন বাবার মৃত্যুর পর মায়ের জন্য বয়স্ক ভাতার কার্ডটি সংগ্রহেও। ঠাকুরগাঁও জেলার অসহায় যুবক আল-আমিন জানান, একটি চাকরির আশায় তিন বছর ধরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনের আশপাশে ঘুরে অবশেষে ব্যর্থ হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে এসেছেন। সাক্ষরতা আন্দোলনের নায়ক মোকছেদ আলীর জন্ম ১৯৫৫ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের কচুবাড়ী এলাকার এক দরিদ্র পরিবারে। বাবার অভাবের সংসারের মধ্যেও এইচএসসি পাস করেন তিনি। ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকার দেশব্যাপী সাক্ষরতা আন্দোলনের ডাক দিলে সবার আগে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন ঠাকুরগাঁও সদরের এই সন্তান। বাড়ির পাশেই পল্লী উন্নয়ন নামে একটি ক্লাবে স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে পাঠশালা গড়ে তোলেন এবং দিন-রাত একাকার করে বিনা পারিশ্রমিকে স্থানীয় মানুষজনকে অক্ষর জ্ঞান দেন তিনি।
১৯৭৪ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদকে ভূষিত হন । মোকছেদ আলীর এই সাফল্যের কথা শুনে একই সালের ২৭ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ের কচুবাড়ী এলাকায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২০০০ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরিবারে তখন স্ত্রী ও তিন সন্তান। অসুস্থতার মধ্যেই বড় মেয়ে আমিনা নুরীকে বিয়ে দেন তিনি। অসুস্থ এই মানুষটিকে নিয়ে হিমশিম খেতে শুরু করেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। বাবার চিকিৎসার টাকা সংগ্রহে কৃষি জমিটুকুও বেচে দেন ছেলে আল-আমিন। এক পর্যায়ে সব ২০০৭ সালে মারা যান মোকছেদ আলী।
মোকছেদ আলীর মৃত্যুর পর দেশের জন্য এই মানুষটির অবদানের কথা ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তুলে ধরেন। কিন্তু সরকারের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের কারো নজরে আসেনি এই পরিবারটির অসহায়ত্ব। মোকছেদ আলীর ছেলে আল-আমিন বলেন, বাবার মৃত্যুর পর স্থানীয় সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের কাছে এমএলএসএস পদে আমাকে একটি চাকরি দেয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু আজও আমার চাকরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘কিন্তু যতবারই তৎকালীন জেলা প্রশাসক শহীদুজ্জামানেরর কাছে গেছি, তিনি আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু এভাবে ছয়মাস আমাকে ঘুরিয়েছেন। কিন্তু, চাকরি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘২০১১ সালে সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের সুপারিশ নিয়ে একটি আবেদনপত্রসহ তিন বছর ধরে ঘুরেছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু আমাকে দেখা করতে দেয়নি।’
আল-আমিন বলেন, ‘আমার মায়ের জন্য একটি বিধবা ভাতা কার্ডের জন্য এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে একাধিকবার গিয়েছি। কিন্তু একটি কার্ডও পেলাম না। আমার বাবার বিশাল এই পরিচিতি শুধু মুখে মুখেই। দূর থেকে কোনো ভাবে চেনার উপায় নেই- এটিই মকছেদ আলীর সেই গ্রাম।’ সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার ভেতরে আমাদের গ্রাম। এই রাস্তাটি আমার বাবার নামে নামকরণ করা হোক। তাহলে আগামী প্রজন্ম সহজেই জানতে পারবে, কে এই মকছেদ আলী!’ এ ব্যাপারে সালন্দর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহাবুর হোসেন মুকুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে একটি কার্ডের ব্যবস্থা করে দেবো।’
এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ড.কামরুজ্জামান সেলিম, মোকছেদ আলীর পরিবারের অন্যান্য সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.